আগস্ট ২০২৪ সালে ফেনী জেলায় ঘটে যাওয়া বন্যা ছিল এক ভয়াবহ দুর্যোগ। ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির চাপের কারণে জেলার প্রধান নদীগুলো, বিশেষ করে মুহুরি, কাহুয়া, এবং সিলোনিয়া নদীর পানির স্তর বিপদসীমার উপরে উঠেছিল। এতে জেলার অন্তত ২০০টি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে পানিতে ডুবে যায়, যার ফলে প্রায় ২,০০,০০০ মানুষ আটকা পড়ে।
বন্যার পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, ফেনীর ফুলগাজী,
পরশুরাম, এবং ছাগলনাইয়া উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ফুলগাজী উপজেলায় এই বন্যা ছিল ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে মারাত্মক। নদীর বাঁধ ভেঙে পানি গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করে, যা ঘরবাড়ি, ফসল, এবং গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। অনেক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিতে হয়। তবে, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে দুর্বিষহ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল।এছাড়া বন্যার ফলে ফেনী শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো ডুবে যায়, যার ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্যার পানি এতটাই বেড়ে যায় যে, শহরের বেশিরভাগ সড়ক এবং রাস্তাঘাট ডুবে যায়। বিশেষ করে মিজান রোড, একাডেমি রোড, এবং শহীদ শাহিদুল্লাহ কায়সার রোড সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি প্রবেশ করে।
স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, এবং ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রম চললেও, অনেক জায়গায় বন্যার পানি প্রবল থাকায় উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে ফেনীর কিছু অঞ্চলে নৌকা ব্যবহার করে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি, কারণ পানির উচ্চতা এত বেশি ছিল যে, সেখানে নৌকায় যাতায়াত করা ছিল খুবই কঠিন।
স্থানীয় জনগণও ছিল দুর্বিষহ অবস্থায়। অনেক পরিবার খাদ্য সংকটে ভুগছিল কারণ তাদের রান্নাঘর পানিতে ডুবে গিয়েছিল এবং তারা কোন রান্না করতে পারছিল না। বন্যার ফলে গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও তৈরি হয়। এছাড়া কিছু এলাকায় পানির উচ্চতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, স্থানীয় মানুষজন নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও পায়নি। অনেকে তাদের সম্পদ ও গবাদিপশু ফেলে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
ফেনীর এ ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন সংস্থা
ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও, এ ধরনের বন্যা মোকাবেলা করতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম, খাদ্য এবং পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাঁধ পুনর্নির্মাণের মতো কাজগুলো দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা জরুরি। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বন্যা প্রতিরোধক অবকাঠামো উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।ফেনীর এ বন্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সমন্বিত উদ্যোগ কতটা জরুরি। এই বন্যা ফেনীর মানুষদের জীবনযাত্রায় যে ধাক্কা দিয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে আরও বেশি প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
নোয়াখালির বন্যা ২০২৪ সালে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আগস্ট মাসের শেষের দিকে এই বন্যা বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে নোয়াখালির জনগণকে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ এখনো বন্যার পানিতে আটকে আছে, যা এলাকার জনজীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
নোয়াখালির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানি খুব ধীরে কমছে, ফলে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। প্রচুর মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা বর্তমানে অত্যন্ত ভিড়াক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রাথমিক সাহায্য হিসেবে চাল, শুকনো খাবার, এবং নগদ অর্থ বিতরণ করা হলেও মানুষের কষ্ট কমেনি। এছাড়া, চিকিৎসা সুবিধার অভাব এবং সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
বন্যার ফলে অনেক পরিবার তাদের জীবিকা হারিয়েছে, এবং কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নোয়াখালিতে যাদের প্রাণ হারাতে হয়েছে, তাদের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচজন, এবং অন্যান্য জেলা মিলিয়ে মোট ২৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই বন্যায় লক্ষাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং অনেকেই এখনো নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
এবারের বন্যায় নোয়াখালির মানুষ যে দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছে, তা দীর্ঘ সময়
ধরে তাদের জীবনে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রয়োজনীয় সাহায্যের তুলনায় তা অপ্রতুল।এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এলাকার অবকাঠামো, কৃষি, এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তা থেকে পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে কুমিল্লার বন্যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, যা হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এ বন্যার মূল কারণ ছিল লাগাতার ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ। গোমতী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীর তীরবর্তী এলাকা এবং নিম্নাঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়।
বুড়িচং উপজেলায় গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং আরও অনেকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বিশেষ করে বুড়িচংয়ের কিছু অংশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যেখানে কোনো বিদ্যুৎ বা মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। স্থানীয় প্রশাসন এবং ত্রাণ সংস্থাগুলো নিরলসভাবে কাজ করলেও বন্যার ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে, ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়।
এছাড়া, গোমতী নদীর পানি বিপদসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার উপরে উঠেছিল, যা এই অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে তোলে। এতে বিশেষ করে চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, এবং নাঙ্গলকোট উপজেলার মানুষেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই বন্যায় কমপক্ষে ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে, এবং কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। অনেক কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও, পরিস্থিতি এখনও অনেকটা সংকটাপন্ন রয়েছে, এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হলেও তা দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।







0 Comments